top of page

অনুকূল চন্দ্র চক্রবর্তী কী ভগবান?


অনূকূল চন্দ্র চক্রবর্তী। এই ব্যাক্তি সৎসঙ্গ নামক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। বর্তমানে ইনার শিষ্যরা তাকে ভগবান বানানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। শোনা যায় তিনি নিজেও নাকি বলেছেন যে তিনি পরম-পুরুষোত্তম। অন্তত তার মূর্খ শিষ্যেরা তেমনটিই প্রচার করেন। তাদের এই মিথ্যচারের জবাব একটি রূপক কনভার্সেশনের মাধ্যমে দেয়া হল।


সৎসঙ্গী: ভাগবতে (১১।১১।৪৮) বলা হয়েছে,


প্রায়েন ভক্তিযোগেন সৎসঙ্গেন বিনোদ্ধব।

নোপায়ো বিদ্যতে সম্যক্ প্রায়ণং হি সতামহম্।।


দেখুন এখানে ঠাকুরের সঙ্ঘের নাম দেয়া আছে। এর থেকে বোঝা যায় ঠাকুর ভগবান। তিনি বলছেন সৎসঙ্গ ছাড়া তাকে পাওয়া যাবে না।


তর্করত্ন: না, আপনাদের এই দাবী মিথ্যা। এই শ্লোকে সৎসঙ্গ শব্দ দ্বারা কোন সংগঠনকে বোঝানো হয়নি। এখানে সৎসঙ্গ শব্দের অর্থ হল সাধু-ভক্তগণের সঙ্গ। কাজেই এর দ্বারা আপনাদের ঠাকুরের ভগবত্বা সিদ্ধ হয় না।


আর তাছাড়া যদি ধরেও নেই যে এখানে কোন সংগঠনের কথা বলা হয়েছে, তাহলেও এর দ্বারা অনুকূল চন্দ্র চক্রবর্তীর ভগবত্বা সিদ্ধ হয় না। কারণ একটা নাম দিয়ে কিছুই যায় আসে না। তেমন হলে আমিও সৎসঙ্গ নামক একটি সংগঠন খুলে ভগবান হয়ে যাব। কিন্তু তা হবে মূর্খের কার্যকলাপ।


সৎসঙ্গী: মহাভারতের অনুশাসন পর্বে বিষ্ণু সহস্রনামে আমাদের থাকুরের নাম আছে। এই দেখুন,



তর্করত্ন: ভগবানের এক নাম অনুকূল, পরন্তু এটা দিয়ে আপনাদের ঠাকুরকে বোঝানো হয়নি। প্রথমেই আমাদের এখানে অনুকূল নামের অর্থ বুঝতে হবে। এই শ্লোকের ভারতকৌমুদী টীকয় বলা হয়েছে,


অনুকূলো ভক্তানামসুগুণঃ, অর্থাৎ যিনি তার ভক্তদের সুহৃদ



এই কথাটিই আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন গৌড়ীয় বেদান্তাচার্য শ্রীপাদ বলদেব বিদ্যাভূষণ। তিনি এই শ্লোকে অনুকূল নামের ভাষ্যে লিখেছেন,

তিনি মথুরাবাসী এবং অন্যান্য সকল জীবের প্রতি দয়াবান এবং শুভাকাঙ্খী।


এর থেকে বোঝা যায় এখানে শ্রীকৃষ্ণের কথাই বলা হচ্ছে। তাছাড়া অবতারের সকল বৈশিষ্ট্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শাস্ত্রে বর্ণিত থাকে। কেবল নাম দিয়ে কারোর অবতারত্ব সিদ্ধ হয় না। ভগবানের নামানুসারে ব্যাক্তির নামকরণ একটি প্রাচীন বৈদিক প্রথা। কিন্তু তাতে কোন ব্যাক্তি ভগবান হয়ে যান না। তা না হলে অনুকূল নামের সকলেই ভগবান হয়ে যেতেন। শুধু অনুকূল নয় নারায়ণ, কৃষ্ণ, রাম নামের অনেক মানুষই দেখা যায় তারা সকলে কী ভগবান?


সৎসঙ্গী: শাস্ত্রে আছে কল্কি অবতার আসবেন এবং তিনি শ্বেত অশ্বে আরোহণ করবেন এবং তরবারি দ্বারা সত্য প্রতিষ্ঠা করবেন। ঠাকুর তার শ্বেত অশ্বরূপী ঋত্বিকদের কাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং জ্ঞানের তরবারি দ্বারা সত্য প্রতিষ্ঠা করছেন। কাজেই শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র হলেন কল্কি অবতার।


তর্করত্ন: না, আপনাদের এই দাবী মিথ্যা ও অবান্তর। আগেই বলেছি অবতারের সমস্ত বৈশিষ্ট্য শাস্ত্রে প্রত্যক্ষরূপে উল্লেখ থাকে। আমাদের শাস্ত্রে কল্কি অবতারের বর্ণণা দিতে গিয়ে কোন ঋত্বিক রূপ অশ্ব কিংবা জ্ঞানরূপ তরবারির কথা বলা হয়নি। বরং প্রাণী এবং অস্ত্রই বোঝানো হয়েছে। এসম্পর্কে শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে,


অশ্বমাশুগমারহ্য দেবদত্তং জগৎপতিঃ।

অসিনাসাধুদমনমষ্টৈশ্বর্যগুণান্বিতঃ।।

বিচরন্নাশুন্না ক্ষৌণ্যাং হয়পনাপ্রতিমদ্যুতিঃ।

নৃপলিঙ্গোচ্ছদো দস্যূণ কোটিশো নিহোনিষ্যতি।।


জগৎপতি ভগবান কল্কি তার দ্রুতগামী দেবদত্ত নামক ঘােড়ায় চড়ে, হাতে অসি নিয়ে তার আট প্রকার যােগৈশ্বর্য এবং আট প্রকার বিশেষ ভগবৎ-ঐশ্বর্য প্রকট করে পৃথিবীর উপর বিচরণ করবেন। তার অপ্রতিম প্রভা প্রদর্শন করে এবং অতি দ্রুত বেগে ভ্রমণ করে তিনি কোটি কোটি রাজপােষাক পরিহিত দস্যু তস্করদের হত্যা করবেন। (শ্রীমদ্ভাগবত ১২।২।১৯-২০)


এখানে স্পষ্টভাবে দেবদত্ত নামক ঘোড়ার কথা বলা হয়েছে এবং অসি নামক তরবারির কথা বলা হয়েছে। এছাড়া কল্কিপুরাণে দেখা যায় ভগবান শিব কল্কিদেবকে বলছেন,


ত্বং গারুড়মিদং চাশ্বং কামগং বহুরূপিণম্।

শুকমেনঞ্চ সর্বজ্ঞং ময়াদত্তং গৃহাণ ভোঃ।।


এই যে অশ্বটি দেখিতেছ, এটি গরুড়ের অংশ সম্ভূত। এই অশ্বটি কামগামী এবং বহুরূপী। এই শুকপক্ষীটি সর্বজ্ঞ। আমি এই অশ্ব ও শুকপক্ষীটি তোমাকে দিতেছি, গ্রহণ কর। (কল্কিপুরাণ ১।৩।২৫)


কাজেই বোঝা যায় শাস্ত্রে অশ্ব বলতে চতুষ্পদ প্রাণী এবং তরবারি বলতে ধাতব অস্ত্রকেই বোঝানো হয়েছে। কাজেই আপনাদের এই যুক্তি খাটে না। এছাড়া আরও বহু ক্ষেত্রেই অনুকূল চন্দ্র এবং কল্কি অবতারের অমিল রয়েছে। যেমন:


➤ কল্কিপুরাণ (১।২।২৯) এবং শ্রীমদ্ভাগবত (১২।২।১৮) অনুসারে কলিযুগ অবসানে বিষ্ণুর অবতারের নাম কল্কি, পক্ষান্তরে আপনাদের ঠাকুরের নাম অনুকূল চন্দ্র চক্রবর্তী।


➤ কল্কিপুরাণ (১।২।৪) এবং শ্রীমদ্ভাগবত (১২।২।১৮) অনুসারে কল্কি অবতারের পিতার নাম হবে বিষ্ণুযশ, পক্ষান্তের অনুকূল চন্দ্রের পিতার নাম শিব চন্দ্র চক্রবর্তী।


➤ কল্কিপুরাণ (১।২।১১) অনুসারে কল্কি অবতারের মাতার নাম সুমতি, অপরদিকে অনুকূল চন্দ্রের মাতার নাম মনমোহিনী দেবী।


➤ কল্কিপুরাণ (১।২।১৯) হতে জানা যায় ভগবান প্রথমে চতুর্ভুজ রূপে আবির্ভূত হবেন। কিন্তু অনুকূল চন্দ্র সাধারণ মানব শিশুর মতোই জন্ম নিয়েছিলেন।


➤ কল্কিপুরাণ (১।২।১৫) হতে জানা যায় কল্কি অবতার মাধব মাসের শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে জন্মগ্রহণ করবেন। মাধব মাস হল বাংলা বৈশাখ এবখ ইংরেজি এপ্রিল মাসের সমান্তরাল। অপরদিকে অনুকূল চন্দ্রের জন্মতারিখ ২৭ জানুয়ারি ১৯৬৯ যা মাঘ মাসের সমান্তরাল।


➤ কল্কিপুরাণ (১।২।১০) এবং শ্রীমদ্ভাগবত (১২।২।১৮) অনুসারে কল্কি অবতার শম্ভল গ্রামে জন্মগ্রহণ করবেন। ভারতের উত্তরপ্রদেশে শম্ভল নামক একটি গ্রাম দেখা যায়। পক্ষান্তরে অনুকূল চন্দ্রের জন্মস্থান পাবনা জেলার হিমাইতপুর গ্রামে যা পূর্বভারত (বাংলাদেশ) এর অংশ।


➤ কল্কিপুরাণ (১।৩।৫) অনুসারে কল্কি অবতার পরশুরামের নিকট বেদাধ্যয়ন করবেন। কিন্তু অনুকূল চন্দ্রের জীবনীতে এমন কিছু পাওয়া যায় না।


➤ কল্কিপুরাণ (২।৩।৬-১০) অনুসারে কল্কি অবতারের পত্নী হবেন পদ্মাবতী এবং কল্কিপুরাণ (১।৪।৩১-৩৫) হতে জানা যায় এই পদ্মা সিংহল দ্বীপের রাজা বৃহদ্রত এর কন্য। পক্ষান্তের অনুকূল চন্দ্রের পত্নীর নাম ষোড়শীবালা দেবী (বীণাপাণি দেবী) যার জন্মস্থান বরিশাল।


➤ শ্রীমদ্ভাগবত (১২।২।২৩) অনুসারে কল্কি অবতার আবির্ভাবের পর কলিযুগ অবসান হয়ে সত্যযুগের সূচনা হবে। বর্তমান পৃথিবীর অবস্থা দেখে যে কেউ বুঝতে পারে যে সত্য যুগ এখনো আসেনি। কাজেই এটাও প্রমাণিত যে কল্কি অবতার এখনো অবতীর্ণ হননি। কাজেই অনুকূল চন্দ্র কল্কি অবতার নন।


সৎসঙ্গী: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন তিনি আরও দুবার আসবেন। তার একজন ঠাকুর রামকৃষ্ণ আর আরেকজন শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র।


তর্করত্ন: মহাপ্রভু বলেছেন তিনি আরও দুবার আসবেন। কিন্তু তা রামকৃষ্ণ এবং অনুকূল নয়। তিনি কীরূপে আসবেন তার বর্ণণা দিয়ে শ্রীচৈতন্য ভাগবতে মধ্যখন্ডে ২৭ তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে,


প্রভু বলে, মাতা তুমি স্থির কর মন।

শুন যত জন্ম আমি তোমার নন্দন।। ৩৯


চিত্ত দিয়া শুনহ আপন গুণ গ্রাম।

কোন কালে আছিল তেমার পৃশ্নি নাম।। ৪০


তথায় আছিলা তুমি আমার জননী।

তবে তুমি স্বর্গে হৈলে অদিতি আপনি।। ৪১


তবে আমি হৈনু বামন-অবতার।

তথাও আছিলা তুমি জননী আমার।। ৪২


তবে তুমি দেবহূতি হৈলা আর বার।

তথাও কপিল আমি নন্দন তোমার।। ৪৩


তবে ত’ ‘কৌশল্যা হৈলা আর বার তুমি।

তথাও তোমার পুত্র রামচন্দ্র আমি।। ৪৪


তবে তুমি মথুরায় দেবকী হইলা।

কংসাসুর অন্তপুরে বন্ধনে আছিলা।। ৪৫


তথাও আমার তুমি আছিলা জননী।

তুমি সেই দেবকী তোমার পুত্র আমি।। ৪৬


আর দুই জন্ম এই সংকীর্ত্তনারম্ভে।

হইব তোমার পুৃত্র আমি অবিলম্বে।। ৪৭


‘মোর অর্চ্চা মূর্ত্তি’ মাতা তুমি সে ধরণী।

জিহ্বারূপা তুমি মাতা নামের জননী।। ৪৮


এই মত তুমি আমার মাতা জন্মে জন্মে।

তোমার আমার কভু ত্যাগ নাহি মর্ম্মে।। ৪৯


দেখুন এখানে মহাপ্রভু স্বয়ং তার দুইরূপের কথা বলছেন আর সেগুলো হল ❝অর্চাবিগ্রহ❞ এবং তার ❝নাম❞ অর্থাৎ,


হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।

হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।


এই হল মহাপ্রভুর দুই রূপ।


সৎসঙ্গী: রামকৃষ্ণও বলেছপন তিনি আবার আসবেন। তিনিই ঠাকুর রূপে এসেছেন।


তর্করত্ন: রামকৃষ্ণ একজন সাধারণ মানুষই ছিলেন। কাজেই তার কথা দ্বারা আপনাদের ঠাকুরের ভগবত্বা সিদ্ধ হয় না। কোন শাস্ত্রেই আপনাদের ঠাকুরের কথা নেই। তাই সময় আছে, শুভঙ্করের ফাঁকি পরিত্যাগ করে শুদ্ধ সনাতন ধর্ম গ্রহণ করুন।


জয় শ্রী রাধে!

হরে কৃষ্ণ!

জয় শ্রী রাধে!

হরে কৃষ্ণ!

986 views0 comments

Comments


Be Inspired
bottom of page