top of page

"#অাচণ্ডালে_কোলে_নেয়_নিত্যানন্দের_দয়া;- (#পর্ব_নয়_পোষ্ট_৩৫)


"#অাচণ্ডালে_কোলে_নেয়_নিত্যানন্দের_দয়া;-


(#পর্ব_নয়_পোষ্ট_৩৫)


#কলিহত_জীবের_উদ্ধারের

জন্য মহাপ্রভু শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুকে নির্দেশ দিয়েছিলেন- নয়নে দেখিবে যারে মধুর হরিনাম কৃষ্ণনাম শুনাবে তারে ৷

"মহোৎসব মাগিয়া নাচেন সংকীর্ত্তনে ৷ হেন যুক্তি তোমারে দিলেক কোন জনে॥"-মহোৎসব করবার যুক্তি মহাপ্রভু শ্রীনিত্যানন্দপ্রভুকে দেন নাই,সত্যই মহাপ্রভু যদি চিড়া-মহোৎসবে সশরীরে এসে থাকেন, কিন্বা ভাব-শরীর নিয়েও এসে থাকেন("মহাপ্রভু দর্শন পায় কোন কোন ভাগ্যবানে") তাহলে শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু,মহাপ্রভুকে স্পষ্টই বলেছিলেন-"'কাঠিন্য কীর্ত্তন কলিযুগ ধর্ম্ম নহে"' ৷ মহোৎসবে জাতিভেদ ভঙ্গকারী পংক্তি-ভোজন,শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুই প্রবর্তন করেন ৷ হরিনাম প্রচারের সাফল্যের জন্য জাতিভেদ বিরোধী মহোৎসবের প্রয়োজন আছে ৷ প্রয়োজনবোধেই শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু মহোৎসব প্রবর্ত্তন করেছিলেন ৷ বিনা প্রয়োজনে করেন নাই, শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু এক্ষেত্রে অধিকতর উদার ৷ শ্রীনিত্যানন্দপ্রভুর এই আচরণের বিরুদ্ধে কটাক্ষ করে নীলাচলে মহাপ্রভুর কাছে অভিযোগও করা হয় ৷ স্পষ্টই বুঝা যায়,মহাপ্রভু হেন যুক্তি দেন নাই ৷বরং কথার ভাবে বুঝা যায়,ইহা তাঁর অভিপ্রেত নয় ৷ এসব শুনে শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু বিচলিত হন নাই,একটু হেসেছিলেন মাত্র ৷ স্থান-কাল-পাত্র উপযোগী যে সহজ প্রচার পদ্ধতি শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু অবলম্বন করেছিলেন,সেটাই যুগ-প্রয়োজন বলে মহাপ্রভুকে বুঝিয়ে নিজ মত বহাল রাখলেন ৷ শ্রীনিত্যানন্দপ্রভুর গৌড়দেশে প্রচার সম্বন্ধে মহাপ্রভুর সঙ্গে তাঁর কথোপকথন হয়েছিল এবং শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু"'কাঠিন্য কীর্ত্তন কলিযুগ ধর্ম্ম নহে"'-এই কথা বলে মহাপ্রভুকে প্রবোধ দিয়ে নিজ মত ও নিজের প্রচার-পদ্ধতি বহাল রাখলেন, এতে মহাপ্রভু আর কোন আপত্তি করলেন না-"'অক্রোধ পরমানন্দ নিত্যানন্দ রায় ৷ অভিমানশূন্য নিতাই নগরে বেড়ায়॥"' তারপর-"'পতিতেরে নিরখিয়া দুই বাহু পশারিয়া ; আইস আইস বলি দেয় ক্রোড়"'-এই-ই শ্রীনিত্যানন্দপ্রভুর-চরিত্রের বিশেষত্ত্ব ৷

#শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু গঙ্গার উভয় তীরে গ্রামে গ্রামে প্রেমধর্ম প্রচার করতে লাগলেন,যে প্রেমধর্ম মানুষে মানুষে পার্থক্য স্বীকার করে না ৷ বৈষ্ণবধর্ম মূলতঃ প্রেমধর্ম, এই ধর্মের মূল কথা-"'শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই ৷"'- শ্রীনিত্যানন্দের সঙ্গে সেদিন দ্বিজ-চণ্ডাল,শত্রু-মিত্র প্রভেদ এই প্রেমধর্মের বন্যায় ভেসে যায়, আঘাত করলেও প্রত্যাঘাত করে না এই প্রেম ৷ ব্যক্তিগত সুখ বা পারলৌকিক মুক্তি কাম্য নয়, এই প্রেম আপনাকে নিংড়ে দিয়ে চরিতার্থ লাভ করে ৷ অস্পৃশ্য ক্ষূব্ধ জনতা নিত্যানন্দ প্রভুর চরণতলে পড়ে বুঝি বা সেদিন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল ৷ এমন তো তারা কাউকে কোনদিন পায় নাই ৷ শ্রীনিত্যানন্দের চরণস্পর্শে পক্ষাঘাতগ্রস্ত অঙ্গের মত সমাজের কত বড় এই অস্পৃশ্য অংশ সিংহগর্জনে লাফিয়ে উঠেছিল ৷ * এমন কি আর কখনও হয়েছে ? এমন কি আর কেউ পারিয়াছে ? ষোড়শ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দী পর্য্যন্ত তন্ন তন্ন করে দেখলে দেখা যাবে-এমন আর হয় নাই, এমন আর কেউ পারে নাই ৷

#শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু যখন গৌড়ভূমে প্রচার আরম্ভ করেন (১৫১৬ খৃঃ) তখন হুসেন শাহর রাজত্বকালের শেষ দিক,তারপর হুসেন শাহের জ্যেষ্ঠ পুত্র নসরৎ শাহের রাজত্বকাল (আনু-১৫১৮-২০খৃঃ) শুরু হয় ৷ আর নসরৎ শাহর সম্পূর্ণ রাজত্বকাল-আর নিত্যানন্দপ্রভুর প্রচার-কাল ৷ রাজ শক্তির সঙ্গে সংঘর্ষ ব্যতিরেকে নির্ব্বিঘ্নে এই প্রচার সম্পন্ন হয় নাই ৷ মহাপ্রভুর তিরোভাবের পরেও দ্বাদশ বৎসর (১৫৪৫ খৃঃ) শ্রীনিত্যানন্দপ্রভুর প্রচার করেন ৷ মহাপ্রভুর তিরোভাবের অত্যল্প পরেই শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু বিবাহ করেন ৷ *"বৈষ্ণব-সমাজে মহাপ্রভু দিলেন সন্ন্যাসের আদর্শ, আর শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু দিলেন গার্হস্থ্যের আদর্শ ৷ মহাপ্রভু যদি প্রয়োজনবোধে সন্ন্যাস নিয়ে থাকেন, তবে প্রয়োজনবোধেই শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু গার্হস্থ্য অবলম্বন করেছিলেন ৷"'*

#মহাপ্রভুর অন্তর্দ্ধানের (১৫৩৩খৃঃ) সময় শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু গৌড়দেশে আচণ্ডালে বৈষ্ণব-ধর্ম প্রচারকার্য্যে ব্যাপৃত ছিলেন ৷ এবার নীলাচল থেকে গৌড়দেশে সংবাদ এল-"চৈতন্য বৈকুণ্ঠ গেলা জম্বুদ্বীপ ছাড়ি ৷"-তারপর-"অনেক সেবক সর্প দংশাইঞা মৈল ৷ উল্কাপাত বজ্রপাত ভুমিকম্প হৈল॥ নিত্যানন্দ অদ্বৈত আচার্য্য গোসাঞি শুনি ৷ বিষ্ণুপ্রিয়া মূর্চ্ছা গেলা শচী ঠাকুরাণী॥"(চৈ,মঃ)


চৈতন্যবিজয় শুনে শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু প্রথমে সপারিষদ নিঃশব্দ হলেন ৷ "চৈতন্যবিজয় লীলা করিয়া শ্রবণ ৷"-পরে শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু কি করে, কবে, কীরূপে অন্তর্দ্ধান হয়েছেন-জিজ্ঞাসা করলেন ৷ ক্ষণিক পরে পাছে মহাপ্রভুর তিরোভাবে বৈষ্ণবেরা হতাশ হয়ে পড়েন, প্রচারে বাধা আসে, তাই গম্ভীর স্বরে শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু ঘোষণা করলেন-"নিত্যানন্দ স্বরূপ সে যদি নাম ধরোঁ ৷ আচণ্ডাল আদি যদি বৈষ্ণব না করোঁ॥ জাতি ভেদ না করিব চণ্ডাল যবনে ৷ প্রেমভক্তি দিঞা সভায় নাচামু কীর্ত্তনে॥

কুলবধূ নাচাইমু কীর্ত্তনানন্দে ৷

অন্ধ বধির পঙ্গু নাচিবে স্বচ্ছন্দে॥ অদ্বৈত আইমু চৈতন্য ন আইমু সৈ চৈতন্য ৷ গৌড় উৎকল রাজ্য করিমু ধন্য ধন্য॥"(চৈ,মঃ-উত্তখণ্ড) -- #মহাপ্রভুর অন্তর্দ্ধানের পরমুহূর্ত্তেই শ্রীনিত্যানন্দপ্রভুর মুখে বাঙালীর বৈষ্ণব-ধর্ মর্ম্মকথাবার দ্বিগুণ উৎসাহে ঘোষিত হল ৷ চণ্ডালে-যবনে, যে বৈষ্ণব জাতিভেদ করবে না-কুলবধূ কীর্ত্তন-আনন্দে নাচবে; অন্ধ,বধির ও পঙ্গু স্বচ্ছন্দে নাচবে; গৌড় ও উৎকল রাজ্য ধন্য ধন্য হবে ৷

#বিংশ শতাব্দীর বাঙালী কান পেতে শ্রীনিত্যানন্দপ্রভুর এই অভিভাষণ শুন, আর ষোড়শ শতাব্দীতে শ্রীচৈতন্যদেবের প্রদত্ত বৈষ্ণব-ধর্ম্মে বাঙালীর "সে বজ্রনির্ঘোষে কি ছিল বারতা" নির্জ্জনে বসে চিন্তা কর ৷ কারণ:— #বর্তমানে ধর্মের ওপর সেরকম কোন প্রত্যক্ষ আঘাত না এলেও আমরা ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছি অন্য কারণে ৷ ভোগবাদে আচ্ছন্ন আমরা নিজেদের কর্মজীবন গঠনে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ছি,ধর্ম বা কোন সৎ আদর্শে জীবনকে গড়ে নেওয়ার চেষ্টা নাই ৷ ছেলেবেলা থেকে সাফল্যের ওপর জোর দেওয়ার ফলে দয়া,শ্রদ্ধা,ভালবাসা,সত্যভাষণ,অহিংসা, সরলতা প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তি গুলির বিকাশ জীবনে নাই- ধর্মানুরাগ তো দূরের কথা ৷ ফলে কর্মজীবনে স্বার্থপরতা,অসাধুতা, পারস্পরিক হিংসা,মিথ্যাভাষণ,নিষ্ঠুরতা প্রভৃতি কুপ্রবৃত্তির বৃদ্ধি হচ্ছে ৷ স্বার্থে সামান্য ঘা লাগলে মানুষ হয়ে উঠছে হিংস্র ৷ সামান্য কারণে আত্মহত্যা, খুন-জখম, পারিবারিক অশান্তি,বিবাহ বিচ্ছেদ ইত্যাদি পাশ্চাত্যের কুলক্ষণগুলি বিশ্বায়নের খোলা হাওয়ায় উড়ে আসছে ৷ কালের সঙ্গে সমাজের অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তন মেনে নিয়েও বলতে হয়, আমাদের জাতীয় ধর্ম সংস্কৃতি থেকে সরে গেলে সমাজের মঙ্গল হবে না ৷

#এ_হেন_অদ্ভুত_আধারে শ্রীচৈতন্য, শ্রীনিত্যানন্দের ত্যাগ, তিতিক্ষা,সাম্য,অহিংসা, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ভালবাসার আদর্শ পথ দেখাতে পারে ৷

*(#জয়_নিতাই!)*

2 views0 comments

Comments


Be Inspired
bottom of page