top of page

#কীর্তনে_গৌরচন্দ্রিকা;— (#পর্ব_নয়_পোষ্টনং_২৪)"


#কীর্তনে_গৌরচন্দ্রিকা;—


(#পর্ব_নয়_পোষ্টনং_২৪)"


"রাই রূপে তার অঙ্গ ঢাকা ৷

হেরিলাম গৌর বাঁকা॥"

শ্রীগৌরাঙ্গসুন্দর অামাদের সেই "নাগর বনমালী" মদনমোহন ৷ কিন্তু তাঁর রইরূপে নীলকান্তমণি অঙ্গকান্তি ঢাকা পড়েছে ৷ তিনি যে শুধু শ্রীরাধিকার কান্তি চুরি করেছেন,তা নয় ৷ তিনি সেই মহাভাব স্বরূপিণীর ভাবরাশিও অঙ্গিকার করে এসেছেন ৷ তিনি কখনও প্রেমের কাঙ্গাল, কখনও অাবার প্রেমের ঠাকুর, তিনি প্রেমিক শিরোমণি, অাবার কখনও তিনি শ্রীরাধার ভাবে বিভাবিত হয়ে "হা কৃষ্ণ, হা কৃষ্ণ" বলে কেঁদে অাকুল, কখনও অাবার "জয়রাধে শ্রীরাধে" বলতে বলতে গড়াগড়ি দেন ; তিনি কখনও ভক্ত, অাবার কখনও ভগবান, তিনি সন্ন্যাসী,ত্যাগী, বৈরাগী ৷ অথচ তিনি শুষ্ক, নীরস ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে ব্রহ্মানন্দে নিমগ্ন থাকেন নাই ৷ তিনি যোগীর ন্যায় সর্ব্বেন্দ্রিয় বৃত্তি রোধ করে নিষ্কম্প প্রদীপের মত ধীর স্থির, অচঞ্চল ভাবে জীবন অতিবাহিত করেন নাই ৷ তিনি শ্রীরাধাকৃষ্ণের প্রণয়মহিমায় বিভোর হয়ে থাকতেন, নিভৃতে স্বরূপ রামানন্দের মত ভক্তের সঙ্গে চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি,জয়দেব প্রভৃতির পদাবলী অাস্বাদন করতেন অার কেঁদে কেঁদে অাকুল হতেন ৷কখনও কখনও ভাবের অাতিশয্যে বাহ্যজ্ঞান হারাতেন ৷ তাঁর চোখের জলে পাষাণ গলে যেত,তাঁর এই দিব্যোন্মাদনা পূর্ণ গানে ভাবের যমুনা উজান বইতে অারম্ভ করেছিল ৷ শ্রীজগন্নাথদেবের মন্দিরের মধ্যে গরুড়-স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে যখন তিনি শ্রীজগন্নাথ দর্শন করতেন, তখন তাঁর নয়নের জলে সেখানকার খাল ভরে যেত, এমন দৃশ্য পূর্ব্বে বা পরে কেউ কখনও দেখেও নাই অার শোনেও নাই;—

"গরুড়ের সন্নিধানে,

রহি করে দরশনে,

সে অানন্দের কি কহিব বলে ৷

গরুড়স্তম্ভের তলে,

অাছে এক নিম্নখালে,

সে খাল ভরিল অশ্রুজলে॥

(চৈ;চ;-২/২/৪৭) গরুড় স্তম্ভের মূলদেশে একটি গর্ত অাছে ৷ শ্রীজগন্নাথ দর্শনে মহাপ্রভুর যে প্রেমাশ্রু নির্গত হত,সেই অশ্রুতেই ওই গর্তটি পূর্ণ হয়ে যেত ৷ অার মহাপ্রভু রাধাভাবে বিভোর হয়ে ভাবতেন যে, তিনি কুরুক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণকে দেখছেন ৷ এই কীর্তনের অাদর্শ ৷ এই অনুরাগ, এই ব্যাকুলতা, এই অাকুতি কীর্তনগানের,তথা বৈষ্ণবধর্মের মূল সূত্র ৷ এটিকে বাদ দিলে গান শুধুই অনুষ্ঠান ৷ পূজার যেমন অধিবাস, কীর্তনের সেইরূপ গৌরচন্দ্রিকা ৷ গৌরচন্দ্রিকা অর্থে শ্রীগৌরচন্দ্র সম্বন্ধিয় ৷ কীর্তনে যে রসের গান হবে, গৌরচন্দ্রিকায় সেই রসাশ্রিত পদ গান করতে হয় ৷ এরকম পূর্ব্বাভাস থাকে বলে গৌরচন্দ্রিকার গৌণ অর্থ হচ্ছে সূচনা বা পূর্ব্বাভাস ৷ এটিই গৌরচন্দ্রিকার উদ্দেশ্য ৷ কীর্তন-গান মহাপ্রভুর সম্পত্তি, সেজন্যই শ্রীচৈতন্যনিত্যানন্দকে সংকীর্তনের জনক বলে উল্লেখ করা হয় ৷ কোনও পুরাণ পাঠ করতে হলে নরনারায়ণকে প্রণাম করবার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাসদেবকেও প্রণাম করতে হয় ৷ তেমনি যে করুণাবতার কীর্তনের ভাগীরথী ধারা বাঙলায় এনে ধন্য করেছেন, কীর্তনের প্রারম্ভে তাঁর নাম স্মরণ করে চোখের জল কে না ফেলবে ? তাই-তো গৌরচন্দ্রিকা অামাদের পরম অাদরের অাস্বাদন ৷

মহাপ্রভু স্বয়ং ভগবান, ব্রজেন্দ্রনন্দন কৃষ্ণ, অথবা তাঁর কোন অবতার, অথবা একজন ভক্তশ্রেষ্ঠ এ নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে ৷ কিন্তু শ্রীচৈতন্যদেবের বৈশিষ্ট্য কারোও অস্বীকার করবার উপায় নাই ৷ এমন সন্ন্যাসী অথচ প্রেমিক জগতে অার হয় নাই, পতিত জীবের জন্য এমন করে অজস্র অশ্রু কেউ বিসর্জন করে নাই, এমন করে ভগবানকে ভালবাসা অার কেউ শিক্ষা দেন নাই,এমন করে জীবনের পরতে পরতে কৃষ্ণবিরহ অার কেউ অনুভব করে নাই, জগতের মঙ্গলের জন্য নামপ্রেম এমন করে অার কেউ যেচে যেচে বিলায় নাই ৷ এই মহামহিমময় বৈশিষ্ট্য শ্রীগৌরাঙ্গকে জগতের মহাপুরুষগণের মধ্যে যে এক অতি উচ্চস্থান দিয়েছে, এবং অবতারগণের মধ্যেও যে শ্রেষ্ঠ অাসনে বসিয়েছে, এও অস্বীকার করবার উপায় নাই ৷ তাছাড়াও অামাদের শাস্ত্রে ভক্ত ও ভগবানে বিশেষ প্রভেদ করে নাই;- ভগবান নিজেই বলেছেন, সাধুদিগের হৃদয় অামাতে অর্পিত; অামি সাধুদিগের হৃদয় স্বরূপ ৷ তাঁরা অামাকে ভিন্ন জানেন না; অামিও মুহূর্তের জন্য তাদিকে ভিন্ন জানি না ৷

0 views0 comments

Comments


Be Inspired
bottom of page