top of page

দেব-দেবী ও দাস-দাসী তত্ত্ব

Updated: Oct 21, 2020

দেব-দেবীগণ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দাস”- তত্ত্ব টি নিয়ে অধুনা অনেকেই অবজ্ঞাসূচক এবং নিন্দাজ্ঞাপক মনোভাব প্রকাশ করেন। অনেকের ধারণা তত্ব টি কোনো অধুনা বিদেশি সংগঠন কৃত। বিদেশি সংগঠন/বৈজ্ঞানিক দের সূত্র, তত্ব আমরা প্রতিনিয়তই দৈনন্দিন জীবনে মানছি অবশ্য। তবে তত্ব টি কি আদৌ অধুনা বিদেশি সংগঠন কৃত ? তত্ত্বটির প্রকৃতার্থ‌ই বা কি ?

তত্ত্বটির মূল প্রবক্তা শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু নিজেই। গঙ্গাতটে বালিকাদের বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করতে দেখে মহাপ্রভু তাদের বললেন-



“আমা পূজ, আমি দিব বর।

গঙ্গা-দূর্গা দাসী মোর, মহেশ কিঙ্কর।।“(চৈতন্য চরিতামৃত, আদি ১৪/৫০)


এই দাস/দাসী নিয়ে আমাদের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। যেরকম সম্প্রতি 'বেশ্যা' শব্দটির প্রকৃতার্থ উদঘাটিত হয়েছে।

দাস-দাসী বলতে আমরা বুঝি ক্রীতদাস/মধ্যযুগীর বর্বরতার শিকার/আরব্য সংস্কৃতির অবহেলিত জনগোষ্ঠী যাদের ভোগ্যপণ্যের মতো ব্যবহার করা হয়।

দাস শব্দটির বুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ: দাস্(দান করা)+অ(সম্প্রদানে-অল্)= যাহাকে দান করা হয়।[সূত্র: 'বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, কলিকাতা]


সমাজে পারিশ্রমিক দান অর্থে দান, দাস‌ই প্রচলিত রয়েছে।

কিন্তু পারমার্থিক জগতে 'দাস্য' পদটি অতি মহিমান্বিত ও আকাঙ্ক্ষিত। মহাবীর হনুমানজী দাস্যভাবে শ্রী রামজীর সেবা করতেন। 'কপিপতির্দাস্যেঅথ'

নবধা ভক্তিলক্ষণের অন্যতম হচ্ছে দাস্যভাব।


“শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণোঃ স্মরণং পাদসেবনম্।

অর্চনম বন্দনং দাস্যং সখ্যমাত্মনিবেদনম্।।

ইতি পুংসার্পিতা বিষ্ণৌ ভক্তিশ্চেন্নবলক্ষণা।(শ্রীমদ্ভাগবত ৭/৫/২৩)


এই দাস্যভাব তাঁর শ্রীপাদপদ্মে শরণাগত হ‌ওয়া প্রসঙ্গে “মামেকং শরণং ব্রজ”।

রোজকার তুলসী আরতিতে আমরা স্মরণ করি-



এই নিবেদন ধর, সখীর অনুগতা কর।

সেবা অধিকার দিয়ে করো নিজ দাসী।


এ সুদুর্লভ দাস্যপদ লাভ সকল সাধকেরই আকাঙ্ক্ষিত।


“শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভুর দাসের অনুদাস।

সেবা অভিলাষ মাগে নরোত্তম দাস।।


মহান আচার্য ও সাধকগণ শ্রীভগবানের দাসের অনুদাস হবার আকাঙ্ক্ষা করেছেন। তাই এই দাসত্ব নিঃসন্দেহে জাগতিক দাসত্ব নয়।

দেব-দেবীগণ শ্রীভগবানের আদেশেই কার্য সম্পাদন করেন।

মেধস ঋষি উবাচ-



“করোতি মায়াচ্ছন্নম্ বিষ্ণুমায়া দুরত্যয়া।

নির্গুণস্য কৃষ্ণস্য ত্রিগুণা বিশ্বমাজ্ঞয়া ।।“(ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ প্রকৃতিখণ্ড, ৬২/১৮)


অর্থ: অবিনাশী এ ত্রিগুণময়ী দেবী বিষ্ণুমায়া গুণাতীত পরমব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণের আজ্ঞানুসারেই বিশ্বসংসার মায়ায় আচ্ছন্ন করছেন।

শ্রীভগবানের বহিরঙ্গা/অপরা শক্তি ই ভুবনপূজিতা দূর্গা। যার প্রমাণ শ্রীশ্রীচণ্ডিতেই বর্ণিত হয়েছে।


“যা দেবী সর্বভূতে বিষ্ণুমায়েতি শব্দিতা।

নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ।।


অর্থাৎ, যে দেবী সর্বভূতে (সর্বজীবে) বিষ্ণুমায়ারূপে বিরাজ করেন, তাঁকে বারংবার নমস্কার।


“সম্মোহিতং দেবি সমস্তমেতৎ ।(শ্রীশ্রী চণ্ডী, ১১/৫)

অর্থঃ হে দেবী, আপনি সমস্ত জগৎকে মোহগ্রস্ত করে আছেন।

“মায়ী সৃজতে বিশ্বমেতৎ।।(শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ, ৪/৯)

অর্থ: মায়া তথা প্রকৃতির অধিপতি পরমেশ্বর এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন।


“মম আদেশাৎ”(বিষ্ণুপুরাণ ৫/১/৭০), ভগবানপি বিশ্বাত্মা…যোগমায়া সমাদিশৎ(ভগবত ১০/২/৬)- পরমেশ্বর ভগবানের আদেশানুসারে যোগমায়া কার্য করেন।



“সৃষ্টিস্থিতিপ্রলয়সাধনশক্তিরেকা

ছায়েব যস্য ভুবনানি বিভর্তি দুর্গা।

ইচ্ছানুরূপমপি যস্য চেষ্টতে সা

গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি।।“(ব্রহ্মসংহিতা ৫/৪৪)


অর্থ: স্বরূপশক্তি বা চিৎশক্তির ছায়া-স্বরূপা প্রাপঞ্চিক জগতের সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় সাধিনী মায়াশক্তিই ভুবনপূজিতা দুর্গা, তিনি যাঁর ইচ্ছানুরূপ চেষ্টা করেন, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি।

পূর্বে দাস শব্দটির বুৎপত্তিগত বিশ্লেষণে দান করার প্রসঙ্গ এসেছে। পরমেশ্বর তবে দেবীকে কি প্রদান করেন ?


সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ৷

তাসাং ব্রহ্ম মহদ্যোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা৷৷(ভগবদগীতা ১৪/৪)

অর্থ: হে কৌন্তেয়, সমস্ত যোনিতে যত মূর্তি প্রকাশিত হয় ব্রহ্মরুপ যোনিই তাদের জননী স্বরুপা এবং আমি তাদের বীজ প্রদানকারী পিতা।

পরমেশ্বর ভগবানের নিকট থেকে বীজ প্রাপ্ত হয়েই দেবী ব্রহ্মাণ্ডকে প্রসব করেন তথা ব্রহ্মাণ্ডকে সৃষ্টি করেন।

অর্থাৎ মায়াশক্তি দেবী শ্রীভগবানের আজ্ঞানুসারেই এই জড়জগৎরূপ দুর্গের পরিচালনা করেন।

এস্থানে কোথাও দেবীমায়ের অবজ্ঞা করা হয়নি। কারণ দেবী মাতা স্বয়ং পরম বৈষ্ণবী।


“ত্বং বৈষ্ণবী শক্তি অনন্তবীর্যা ।“(শ্রীশ্রী চণ্ডী ১১/৫)

দেবীর প্রণামমন্ত্রে- “শরণ্যে ত্রম্বকে গৌরী নারায়ণী নমঃহস্তুতে।

“বিষ্ণুভক্তা বিষ্ণুরূপা বিষ্ণোঃ শক্তিস্বরূপিনী।“(ব্র. বৈ পুরাণ ৫৭/২১)



এছাড়া ব্রজগোপীগণ কাত্যায়ানীরূপী দেবীমায়ের(যোগমায়া) আরাধনা করেছিলেন শ্রীভগবানকে পতিরূপে পাবার জন্য। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধারম্ভে অর্জুন দেবীমাতার স্তব করেছিলেন শ্রীভগবানের নির্দেশেই। তাই দেবীমাতার অবজ্ঞা বৈষ্ণব অপরাধ বলেই গণ্য।

অর্থাৎ শাস্ত্রোক্ত দাস-দাসী শব্দটি পরমেশ্বরের প্রতি অপ্রাকৃত দাস্যভাবকেই প্রকাশ করে।

এই দাস্যভাবকে আমাদের জাগতিক বুদ্ধিতে বিচার করে লঘুভাবে গ্রহণ নিতান্তই নির্বুদ্ধিতা।

কৃষ্ণের চরণের দাসী' বলে অবজ্ঞা জ্ঞাপন করে সেই যে ঐ শ্রীচরণের মহিমা অবগত নয়।

আমরা ঐ রাতুলচরণের দাস-দাসীর চরণ আশা করি।

নমস্কার।


88 views0 comments

Comments


Be Inspired
bottom of page