top of page

ধার্ম্মিকের শ্রেণীভেদ

Updated: Sep 17, 2020

শ্রীশ্রীকৃষ্ণচৈতন্যচন্দ্রায় নমঃ


ধার্ম্মিকের শ্রেণীভেদ


বিশ্ববিধাতার সৃষ্টিতে অসংখ্যজাতীয় (দেহধারী ) জীব বর্তমান আছে । তন্মধ্যে মানবজাতিই সৰ্বশ্রেষ্ঠ। কারণ, আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুনাদি সাধারণ ধৰ্ম্ম প্রাণিমাত্রে বিদ্যমান থাকিলেও, মানবগণে জ্ঞান বা বিচারশক্তি অসাধারণরূপে বিদ্যমান আছে। মানবজাতির মধ্যে যাহারা জ্ঞান বা বিচারবুদ্ধিরহিত, তাহারা পশ্বাদির সহিত তুলিত। বিচারবুদ্ধিবিশিষ্ট মানবগণের মধ্যে বিচারবুদ্ধির তারতম্যানুসারে স্থূলতঃ চারিশ্রেণীর সদভিমানী বা ধাৰ্মিকাভিমানী মানব দৃষ্ট হয়েন।



একশ্রেণীর মানব রুচিবাদী, দ্বিতীয় যুক্তিবাদী, তৃতীয় শাস্ত্রবাদী এবং চতুর্থ

শাস্ত্রবুক্তি উভয়বাদী। ক্রমশঃ ইহাদের সম্বন্ধে সংক্ষেপে আলােচনা হইতেছে।




১...রুচিবাদী


প্রথমত, যাহারা রুচিবাদী, তাহাদিগকে দেহারামী, চিত্তসুখবাদী বা স্বেচ্ছাচারী বলা সঙ্গত। কারণ, ইহাদের আপন আপন চিত্তের রুচিমতে যাহা ভালবােধ হয়, যাহা যাহা দেহ ও মনের সুখপ্রদ বিবেচিত হয়, ইহার তত্তদাচরণ করিয়াই তৃপ্তিলাভ করেন। ইহারা ধৰ্ম্মশাস্ত্রোক্ত ধর্ম্মার্ধৰ্ম্ম বা পাপপুণ্য স্বীকার করেন না। অধিকন্তু যাঁহারা ধর্ম্ম শাস্ত্রের আনুগতা বা তদুক্ত পাপপুণ্য স্বীকার করেন, তাঁহাদিগকে

ইহারা অন্ধবিশ্বাসী বলিয়া ঘৃণা করেন। ইহাদিগের মতে যাহাতে মনের শাস্তি হয়, দেহ ও মন সুস্থ ও প্রফুল্ল থাকে, তাহাই আচরণ করা উচিত এবং তাহাই ধর্ম। আর যাহাতে দেহ ও মনের অশান্তি বা ক্লেশ হয়, তাহাই ( দেহ ও মনকে কষ্ট দেওয়াই) পাপ। ইহার মনের সুখকেই আত্মপ্রসাদ বিবেচনা করেন ।

ইহাদের মতে দেহ ও মনই ‘আত্মা’ বা ‘আমি'। এই জন্যই ইহারা সদা দেহ ও মনের সুখশান্তিকর কাৰ্যানুষ্ঠান করিয়া আপনাদিগকে সৎ বা ধার্মিক বলিয়া অভিমান করিয়া থাকেন। ইহার পরমেশ্বর বা পরকাল বিশ্বাস করেন না। মানবমাত্রেরই স্বাতন্ত্র্যাচার বা স্বেচ্ছাচারিতা হারা সংসার ও সমাজের বিশৃঙ্খলা ও পরিণামে ভীষণ অনর্থ সংঘটনের আশঙ্কা করিয়া ইহারা সমাজ ও সংসার সুশৃঙ্খলে চালাইয়া নিজেদের সুখশান্তিভােগের জন্য কতকগুলি মনঃকল্পিত (মনগড়া )

বিধিনিষেধ নিজে নিজে সৃষ্টি করিয়া লয়েন। এইটকুই ইহাদের পশ্বাদি অপেক্ষা অধিক বিচারবুদ্ধি বা জ্ঞান। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, ইহারা স্বেচ্ছাচারী, ও সেচ্ছাচারিতা কেই আত্মপ্রসাদ বলিয়া থাকেন ।



এখন বিচার করা উচিত যে, যদি মনের অভিরুচিমত আচরণ বা স্বেচ্ছাচারিতা আত্মপ্রসাদ বা ধৰ্ম্ম হয়, তাহা হইলে যাঁহারা পরস্ত্রীলাম্পট্য, দস্যুবৃত্তি ও প্রতিহিংসা বশে অন্যের প্রাণবধ প্রভৃতি করিয়া থাকে, তাহাদিগকে দোষী করা যায় না। কারণ, এই সকল কার্য দ্বারা তাহাদেরও মনের সুখ বা ঐ শ্রোণীর আত্মপ্রসাদ নিশ্চয়ই লাভ হয় । সুতরাং তাহাদিগকেও কি সৎ বা ধার্মিক বলিয়া গণ্য করা যাইবে ?


যদি বল, ঐরূপ ( দস্যুতা ও পরস্ত্রীলাম্পট্যাদি) স্বাতন্ত্র্য আচরণে সংসার বা সমাজ উচ্ছৃঙ্খলে যাইবে তজ্জন্য (সমাজাদি সুশৃঙ্খলে চালাইবার জন্য ) কতকগুলি বিধিনিষেধের আনুগত্য স্বীকার করা কর্তব্য। কিন্তু সমাজ বা সংসার সুশঙ্গালে চালাইবার জন্য তােমাদের মনঃকল্পিত বিধিনিষেধের আনুগত্যই বা তাহারা স্বীকার করিবে কেন ? কারণ, তাহাও তত মনঃকল্পিত ! যেহেতু, তােমরাই তাে ধর্মশাস্ত্রোক্ত পাপপুণ্য বা বিধিনিষেধক ব্যক্তিবিশেষের মনঃকল্পিত বলিয়া ত্যাগ করার পথপ্রদর্শক |

সুতরাং, ধীরভাবে এই সব বিবেচনা করিলে দেখিতে বা বুঝিতে পারা যায় , মনে যাহা ভাল বোধ হইবে, তাহাকে আত্মপ্রসাদ ভাব বা তাঁহা আচরণ করা অনুচিত ও অসমীচীন ।




২….যুক্তিবাদী


দ্বিতীয় শ্রেণী বা যাঁহারা যুক্তিবাদী মানব, তাঁহারা প্রথম শেণীর লোকদের মত সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী না হইয়া প্রকৃতিক জগতের কার্যাবলী পর্যবেক্ষণ করতঃ তৎ- প্রাকৃত দৃষ্টান্তের অনুসরণ করিয়া বুদ্ধি দ্বারা কতকগুলি যুক্তিগঠন ও তত্তদ্‌যুক্তিরলপ্রাধান্য স্বীকারপূর্বক সেইসকল যুক্তির আনুগত্যে যাবতীয় আচারানুষ্ঠান করিয়া থাকেন।


এই দ্বিতীয় শ্রেণীর লােকগণও শাস্ত্রানুগত্য স্বীকার করেন না। ইহারাও জগৎ-স্রষ্টা বিধাতা, পরমেশ্বর ও পরকালাদির অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। ইহাদের মতে “সমস্ত জগতই আপন আপন প্রকৃতি বা স্বভাবানুযায়ী সৃষ্ট ও চালিত হইতেছে। স্বভাব বা প্রকৃতিই জগতের স্রষ্টা ও চালক ; পৃথক্‌ স্রষ্টা বা চালক কেহই নাই। প্রাকৃতিক জগৎ যে সব স্বাভাবিক নিয়মে সুশৃঙ্খলে পরিচালিত হইতেছে, মানব-

সমাজও সেই সব দৃষ্টান্তের অনুসরণে সুশৃঙ্খলে চালিত হইবে। ইহাই ধর্ম এবং ইহার বিপরীতাচরণই পাপ”।



কিন্তু ধর্মশাস্ত্র ও পরমেশ্বরের আনুগত্য ব্যতীত কেবল যুক্তি যে অতি হেয়,অকিঞ্চিৎকর ও অস্থায়ী, তাহা বিজ্ঞ ও বহুদর্শী মানবমাত্রেরই সহজে অনুমেয় । কেবল যুক্তির স্থিত্ব কিছুই নাই । কেন না, একজন যুক্তিবিদ একটি প্রাকৃত দৃষ্টান্তের অনুশীলনপূর্বক একটি যুক্তি স্থির করেন, পরে তদপেক্ষা বুদ্ধিমান্ ও চতুর অন্য ব্যক্তি স্বীয় প্রতিভাবলে সেই যুক্তি খণ্ডিত বিখণ্ডিত করিয়া নিজের

যুক্তি স্থাপন করেন। আবার তাহা অপেক্ষাও সুবুদ্ধিমান অতিযুক্তিবিদ আর একজন তাহার যুক্তিকে খণ্ডন করিয়া উচ্চযুক্তিবলে স্বমত স্থাপন করিয়া থাকেন ।

এই কারণে যুক্তির স্থিরত্ব কিছুই নাই। বুদ্ধিমান ও তার্কিক হইলেই একজন অন্যের

যুক্তিকে স্বীয় প্রতিভাবলে অনায়াসে খণ্ডন করিতে পারেন এবং করিয়া থাকেন।

ইহা বিচিত্র বা আশ্চর্য্য নহে।


অনাদিকাল হইতেই এইরূপে যুক্তিবাদী তার্কিগণের গঠিত সিদ্ধান্তসমুহের খণ্ডন স্থাপন চলিয়া আসিতেছে । এই প্রাকৃতিক জগতই যখন অস্থির, ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তনশীল, তখন প্রাকৃতিক দৃষ্টান্তানুসরণে ব্যক্তি স্থিরত্ব কোথায় ?


সুতরাং ঐরূপ অস্থির যুক্তির আনুগত্য স্বীকার করিয়া চলিলে পরিণামে যে কুশল

লাভ হইবে, তাহার স্থিরতা কি ?

বিচার করিয়া দেখিলে যুক্তিও মনঃকল্পিতাচার বা স্বেচ্ছাচারিতার প্রকারভেদ অথবা রূপান্তরমাত্র। কারণ, যুক্তিবাদীদের যাঁহার মনে যাহা ভাল বােধ হয়, তিনি স্বমত প্রতিপোষিণী অনুকূল যুক্তি গঠনপূৰ্ব্বক তাহা স্থাপন করেন । এইরূপে ভিন্ন ভিন্ন রুচিশালী বুদ্ধিমান তার্কিক মানবগণ স্ব স্ব প্রতিভাবলে ভিন্ন ভিন্ন যুক্তি স্থাপনপূর্বক ধর্ম্ম ও আচার বিষয়ে কেবল তর্কমূলক সংশয়, পরিণামে ইহ-সংসার ও সমাজের বিশৃঙ্খলতা, সর্বোপরি আত্মার অকুশল সংঘটন করিতেছেন মাত্র ।


তর্কের দ্বারা ধর্মের মীমাংসা হয় না। কেন না, তর্ক অপ্রতিষ্ঠিত। সুতরাং, ধর্মশাস্ত্র ও পমেশ্বরের আনুগত্য ব্যতীত কেবল যুক্তি স্বেচ্ছাচারী মানবগণের স্বেচ্ছাচারের পোষক ও পরিণামে অকুশলজনক।








৩….শাস্ত্রবাদী


তৃতীয়তঃ, জগতে শাস্ত্রবাদী একশ্রেণীর মানব আছেন। তাঁহারা স্ব স্ব জ্ঞান ও অধিকারমতে ধর্মশাস্ত্রসমূহে অগাধ বিশ্বাস করত শাস্ত্রোক্ত আচারসমূহ পালন করেন। ইহার শাস্ত্রোপদেশের সহিত যুক্তিমিশ্রণের আবশ্যকতা অনুভব করেন না।

অবিচারে শাস্ত্রোক্ত উপদেশসমুহ পালন করিতে ভালবাসেন । শাস্ত্রবিশ্বাসিগণ পরমেশ্বর, পরকাল, স্বর্গ, নরক ও মৃত্যু আদি সমুদয়ই অল্পবিস্তর স্বীকার করেন।

শাস্ত্রবিশ্বাস সমীচীন পন্থা; কারণ, জগতে যত মানব আছেন, তন্মধ্যে হিন্দু, খ্রীষ্টান ও মুসলমানগণই বিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান বলিয়া পরিচিত। এই তিন মহাসম্প্রদায়ই আপনাদের জ্ঞান ও অধিকার মতে ধর্মশাস্ত্র বিশ্বাসী। ইহাদের সকলেরই ধর্মশাস্ত্র আছে এবং সকলেই স্ব স্ব সম্প্রদায়ের ধর্মশাস্ত্রানুমোদিত কৰ্তব্যানুষ্ঠান করিয়া থাকেন। ইহারা পূর্বোক্তরূপ স্বেচ্ছাচারী বা যুক্তিবাদী নহেন। সকলেই শাস্ত্রানুগত্য স্বীকার করিয়া থাকেন। সুতরাং শাস্ত্রবিশ্বাস অন্ধতা নহে, সমীচীন পন্থা।


শাস্ত্র শব্দের মুখ্য অর্থ এই যে, প্রাচীন পরমেশ্বরবিশ্বাসী মত | জন মহাত্মা সাধুগণের (যাঁহার ভগবানের প্রিয় ও অতি নিকটস্থ তাঁহাদের ) আচার ব্যবহার সম্বন্ধে বর্ণনা ও ( ভগবত্তত্ব বা ভগবত্তজনতত্ব সম্বন্ধে ) তাঁহাদের উপদেশপূর্ণ গ্রন্থ অথবা পুস্তক। পরমেশ্বর ও পরলােক আদি আমাদের দৃষ্ট বা প্রত্যক্ষ নহেন। সুতরাং যাঁহারা পরমেশ্বরের কৃপাপাত্র, মহাত্মা, মহাজন বা সাধু বলিয়া প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছেন, (পরমেশ্বরের কৃপাপ্রাপ্তির উপায় সম্বন্ধে ) সেই সব মহানুভবগণের উপদেশপূর্ণ গ্রন্থানুসারে আপনাদিগকে চালিত করাই যে ( পরিণামে কুশলাকাঙ্ক্ষী মানবগণের ) অবশ্য কর্তব্য

তাহাতে আর সন্দেহ কি আছে ?



স্বেচ্ছাচারী উচ্ছল লােকগণই শাস্ত্র, পরলােক বা পরমেশ্বরাদি স্বীকার করেন না। তাহাতে অর্থাৎ শাস্ত্রাদি স্বীকার ও তাহাদের আনুগত্য করিলে তাহাদের স্বেচ্ছাচারের ও স্বাতন্ত্রের বিশেষ হানি হইবে ; তাহা হইলে “যাবজীবেৎ সুখং জীবেৎ ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ” অথবা “কামোপভােগিতা স্বর্গং পাপমাত্মগ্রপীড়নং” ইত্যাদি স্বার্থে ব্যাঘাত হইবে; সংযমের ক্লেশ সহিত হইবে ; তজ্জন্য শাস্ত্রাদি না মানিয়া ইহারা নিজেদের স্বেচ্ছামত যুক্তিতর্ক স্থাপন করেন।

শাস্ত্রবিশ্বাসী ব্যক্তিগণের মত যে সমীচীন, তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে তৎসম্বন্ধে একটি কথা আছে। মানবগণের স্বভাব ও অবস্থাভেদ ও দেশকালাদির অবস্থাভেদের জন্য শাস্ত্রসমুহেভিন্ন ভিন্ন উপদেশ দেখিতে পাওয়া যায়। ইহা অযুক্তও নহে। কারণ, একই চিকিৎসক ভিন্ন ভিন্ন রােগে বা একই রােগের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় ভিন্ন ভিন্ন ঔষধ ও পথ্যের ব্যবস্থা দিয়া থাকেন, ইহা চিরপ্রসিদ্ধ। শাস্ত্রও সেইরূপ জীবগণের ভবরােগের চিকিৎসক। সুতরাং ভবরোগী জীবগণের স্বভাব ও অবস্থাভেদে ভিন্ন

ভিন্ন অধিকারীর জন্য ভিন্ন ভিন্ন উপদেশ দিয়াছেন।

এই জন্য শাস্ত্ৰবৰ্ণিত কোন্ উপদেশ কাহার পক্ষে অনুকূল, কোন্ উপদেশ প্রতিকূল, তাহা বিচার করা অবশ্য কর্তব্য।

বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যক্তির জন্য শাস্ত্র অধিকার-অনুযায়ী যে সকল ভিন্ন ভিন্ন উপদেশ দিয়াছেন, তন্মধ্যে কাহার পক্ষে কোনটী গ্রহণীয়, কোন্‌টি বর্জনীয়, তাহা যুক্তি দ্বারা বিচার না করিয়া শাস্ত্রের যাবতীয় উপদেশগুলি তােতা-পাখীর মত শিক্ষা করিয়া, একই ব্যক্তি যদি সবগুলি শিক্ষা, পালন বা আচরণ করিতে প্রয়াস পান, তবে তাহা অনুচিত, অস্বাভাবিক ও উপহাসের বিষয় তাে হইবেই, 'পরন্তু তাহাতে প্রকৃতধৰ্ম নির্ণীত ও আচরিত হইবে না। বরং স্থলবিশেষে অনর্থ ঘটিবারই সম্ভাবনা।

এই জন্য কেবল শাস্ত্র অবলম্বনপূৰ্ব্বক ধৰ্ম্মাচার পালন না করিয়া শাস্ত্রের সহিত সদ্‌যুক্তিসমূহ মিলাইয়া ধৰ্ম্মনির্ণয় ও ধর্মাচার পালন করাই বিজ্ঞগণের কর্তব্য। শাস্ত্র

বলিয়াছেনঃ---


কেবলং শাস্ত্রমাশ্ৰিত্য ন বিচার্য্য কদাচন ।

যুক্তিহীনবিচারেণ ধৰ্ম্ম হানিঃ প্ৰজায়তে ।।


আর একটি বিশেষ কথা এই যে, শাস্ত্ৰবাক্যে যাঁহার যত অধিক বিশ্বাস উৎপন্ন হয়, তিনি তত দৃঢ়তার সহিত ভজন করতঃ গন্তব্য পথে দ্রুত অগ্রসর হইয়া থাকেন ।

কিন্তু কেবল শাস্ত্ৰবাক্যে অদৃষ্ট বা অপ্রত্যক্ষ তত্ত্ববস্তুতে সুদৃঢ় শ্রদ্ধা হওয়া অসম্ভব। তজ্জন্য প্রাণিগণের দৃষ্ট বা প্রত্যক্ষীভূত বস্তু দ্বারা যদি শাস্ত্রবাক্যের যথার্থ বুঝাইয়া বা দেখাইয়া দিতে পারা যায়, তাহা হইলে শাস্ত্রবাক্যে সাধকগণের যে শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস সুদৃঢ় হইবে, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। মনে কর, শাস্ত্র বলিয়াছেন -

‘যং যং বাপি স্মরণং ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরং।

তং তমেবৈতি কৌন্তেয় ! সদা তদ্ভাবভাবিতঃ ॥”


অর্থাৎ যাঁহা নিরন্তর চিন্তা করা যায়, তাহাই চিত্তকে তন্ময় করে, আবার মৃত্যু কালে যাহা স্মৃতিপথে উদিত হয়, প্রাণিগণের গতিও তদনুরূপ হইয়া থাকে।

বিষয়ে মহাজনেরও প্রতিধ্বনি এইপ্রকার ?


“সাধনে ভাবিবে যাহা, সিদ্ধদেহে পাবে তাহা” ইত্যাদি।


কিন্তু এই শাস্ত্র বা মহাজনবাক্যে, সকলের তেমন শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস উৎপন্ন হয় না। যাহাদিগের ইহাতে সন্দেহ থাকে, তাহাদিগকে নিম্নোক্ত প্রত্যক্ষীভূত বিষয়টি দেখাইয়া যুক্তি দ্বারা বুঝাইয়া দিলে, উল্লিখিত শাস্ত্র বা মহাজনবাক্যে তাঁহাদের কোনও সন্দেহ থাকিতে পারে না।



প্রায় সকলেই জানেন, পেশষ্কৃৎ বিবিধবর্ণের ও বিবিধকারের কীটসকলকে ধরিয়া আনিয়া নিজগর্ভে আবদ্ধ রাখে । ঐ সকল কীট উক্ত পেশষ্কৃৎকে সভয়ে নিরন্তর ধ্যান বা ভাবনা করিয়া, ভাবনার তীব্রতাবশতঃ পূর্বদেহত্যাগ না করিয়াই অল্পকাল মধ্যে পেশষ্কৃতের তুল্য অর্থাৎ ভাবনানুযায়ী দেহবর্ণাদি লাভ করে। জীবিতাবস্থায় যদি পূৰ্বরূপ পরিবন্তিত হইয়া ভাবনানুযায়ী স্বরূপ প্রাপ্তি ঘটতে পারে, তবে যাহারা আপনাদিগকে ভগবানের সেবক ভাবিয়া ইহজীবনে সতত তাঁহার সেবায় নিমগ্ন,

থাকেন, দেহত্যাগের পরে তাঁহারা স্ব স্ব ভাবনানুযায়ী স্বরূপ যে নিশ্চয় প্রাপ্ত হইবেন, এই শাস্ত্ৰবাক্যে আর কি সন্দেহ থাকিতে পারে ?


এই জন্য সযৌক্তিক শাস্ত্রবাক্যই বিশেষ উপকারী। যাঁহারা বুক্তির অনাদর করিয়া কেবল শাস্ত্র বাক্যেরই আদর করেন, তাঁহাদের শ্রদ্ধাও তেমন সুদৃঢ় হয় না।


৪….শাস্ত্র যুক্তি উভয়বাদী


চতুর্থত, আর একশ্রেণীর অতি সারগ্রাহী ধৰ্ম্মানুরাগী ব্যক্তি আছেন, যাঁহারা প্রথমশ্রেণীর ন্যায় কেবল স্বেচ্ছাচারী, দ্বিতীয়শ্রেণীর ন্যায় যুক্তিবাদী-স্বেচ্ছাচারী বা তৃতীয়শ্রেণীর ন্যায় যুক্তিবিচার ত্যাগপূৰ্ব্বক কেবল শাস্ত্রে অন্ধবিশ্বাসী নহেন। ইহারা শাস্ত্র ও যুক্তি উভয় পন্থা অবলম্বনপূৰ্ব্বত্ব স্বীয় স্বীয় রুচি বা মনকে শাস্ত্রযুক্তির অনুগতভাবে পরিচালনপূর্বক ধম্মাচার পালন করেন।



এইরূপ সযৌক্তিক শাস্ত্রাচার প্রতিপালন করিয়া চলেন বলিয়া এই শ্রেণীর সাধকগণ পতিত বা ভ্রষ্ট না হইয়া (দৃঢ় শ্রদ্ধার ফলে) সাধনরাজ্যে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হইয়া থাকেন। ধর্ম বিষয়ে মূলতঃ ও মুখ্যতঃ শাস্ত্রই প্রধান অবলম্বন বটে, কিন্তু যুক্তি তাঁহার সহকারিণীরূপে যথেষ্ট সাহায্য করিয়া থাকে ।


COPY NOT ALLOWED . DON'T DOING COPY ONLY SHARE

71 views0 comments

Comentários


Be Inspired
bottom of page