top of page

মহাভারতন্তর্গত ভগবদগীতা কি প্রক্ষিপ্ত ?(ভারতকৌমুদী অবলম্বনে)

Updated: Sep 16, 2020


প্রক্ষিপ্তবাদী: মহাশয়, ভগবদগীতাটা যে ভীষ্মপর্বে প্রক্ষিপ্ত হইয়াছে, তাহা জানেন?


প্রতিবাদী: কি করিয়া জানিব, কাহাকেও প্রক্ষিপ্ত করিতে দেখিনাই, শোনা কথারও কোনো মূল্য নাই, প্রক্ষেপের যুক্তিও খুজিয়া পাই না।


প্রক্ষিপ্তবাদী: ভীষ্মপর্বের যে স্থানে গীতা সন্নিবেশিত আছে, সে স্থানে গীতা উঠিবার কোনো প্রসঙ্গই নাই।

প্রতিবাদী: যুদ্ধের ১ম দিন হউক আর ১০ম দিন হউক, “আমার পুত্রেরা ও পাণ্ডবেরা যুদ্ধ করিবার ইচ্ছায় কুরুক্ষেত্রে সমবেত হইয়া প্রথমে কি করিল?” ধৃতরাষ্ট্রের এই প্রশ্নই তো গীতা উঠিবার প্রসঙ্গ, এইরূপ প্রসঙ্গ লইয়াই তো মহাভারতের এবং অন্যান্য গ্রন্থের উপাখ্যানগুলি উঠিয়াছে।



প্রক্ষিপ্তবাদী: উভয়পক্ষের যোদ্ধারাই অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত হইয়া আপন আপন সেনাপতির আদেশের প্রতিক্ষা করিতেছেন, এমন সময় উভয় সৈন্যের মধ্যস্থানে থাকিয়া পাণ্ডবপক্ষের প্রধান সহায় কৃষ্ণ গীতা বলিতে আরম্ভ করিলেন,আর প্রধান যোদ্ধা অর্জ্জুন তাহা শুনিতে লাগিলেন। ‘ধান ভানিতে মহীপালের গীত আরম্ভ হইয়া গেল’। এমন ঘটনা কি কখনো সম্ভবপর হইতে পারে?


প্রতিবাদী: ভীষ্মপর্বের ১ম অধ্যায়ে যুদ্ধের নিয়মাবলী বর্ণিত হইয়াছে: “সমাভাষ্য প্রহর্তব্যং ন বিশ্বস্তে ন বিহ্বলে” অর্থাৎ আমরা বলিয়া কহিয়া বিপক্ষের উপর প্রহার করিব এবং কোনো বিপক্ষ বিশ্বস্ত বা বিহ্বল থাকিলে তাহার উপর প্রহার করিব না। সুতরাং কৃষ্ণ ও অর্জ্জুনের এইরূপ দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে তাহাদিগকে না জানাইয়া কেহই প্রহার করিবে না। অতএব তাহারা নিরুদ্বেগ ছিলেন বলিয়া তাহাদের অধ্যাত্মবিষয়ক আলোচনাও সম্ভবপর হইয়াছিল।


প্রক্ষিপ্তবাদী: যে দুর্য্যোধন বাল্যকাল হইতে বিদ্বেষের বশবর্তী হইয়া পাণ্ডবদিগকে বিষপ্রয়োগ, জলে নিক্ষেপ এবং অগ্নিতে দগ্ধ করিয়া মারিয়া ফেলিবার চেষ্টা করিয়াছে, তার উপর বিশ্বাস করিয়া ঐসময়ে কৃষ্ণ ও অর্জ্জুনের মত বুদ্ধিমান লোকদের অন্যমনষ্ক হওয়া কিভাবে সম্ভবপর ?


প্রতিবাদী: সেসময় ভীষ্ম কৌরবপক্ষের সেনাপতি ছিলেন এবং তাহার আদেশ ব্যতিত কৌরবপক্ষের কাহারও কিছু করিবার ক্ষমতা ছিলনা। তাছাড়া কৃষ্ণ ও অর্জ্জুন কচি খোকা ছিলেন না। উভয়েই অতিরথ ও অদ্বিতীয় মহাবীর ছিলেন একথা সকলে জানিত। অতএব দৌড়াইয়া যাইয়া তাহাদিগকে আক্রমণ করিবার সাহস বা তীর নিক্ষেপ করিবার দুঃসাহস কাহারও হয় নাই, কিংবা তাহারাও সেইরূপ আশঙ্কা করেন নাই।তাই তাহাদের গীতার আলোচনায় ব্যাঘাত ঘটেনাই।


প্রক্ষিপ্তবাদী: পুরাণরচয়িতা বেদব্যাস চিরকাল উপাখ্যান লিখিয়া আসিয়াছেন, তিনি যে গীতার মতো সমস্ত সম্প্রদায়ের উপযোগী গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন ইহা কি করিয়া বিশ্বাস করি?


প্রতিবাদী: বেদব্যাস কেবল পুরাণই রচনা করেন নাই, অধ্যাত্মবিষয়ক চরম গ্রন্থ বেদান্তসূত্র বা ব্রহ্মসূত্র এবং পাতঞ্জলভাষ্য প্রভৃতিও লিখিয়ায়াছেন। বেদব্যাসের মতো তত্ত্বদর্শী জ্ঞানী ভারতবর্ষে অদ্বিতীয়।


প্রক্ষিপ্তবাদী: গীতার মৌলিকতাসম্বন্ধে কোনো নির্দোষ যুক্তি আছে কি?

প্রতিবাদী: মহাভারতের পূর্বাপর স্থানগুলো পর্য্যালোচনা করিলে দেখা যায়, অন্যান্য স্থানে যেরূপ ভাষা, যেরূপ ভাব, যে প্রকার ছন্দ এবং অপাণিনীয়(আর্ষ) প্রয়োগ আছে, গীতাতেও সেইরূপ আছে।


প্রক্ষিপ্তবাদী: এ বিষয়ে যথেষ্ট মতভেদও আছে।

প্রতিবাদী: শঙ্করাচার্য, রামানুযাচার্য, মধ্বাচার্য, শ্রীধরস্বামী প্রভৃতি যোগী মহাপুরুষগণ নিঃশঙ্কচিত্ত্বে গীতার ভাষ্য ও টিকা রচনা করিয়ছেন, ইহাতেও গীতার মৌলিকতাই প্রমাণিত হয়।


প্রক্ষিপ্তবাদী: মহাভারত রচনার পর কোনো বিদ্বান ব্যক্তি আধ্যাত্মিক শ্লোকগুলি একত্র করিয়া, মধ্যে মধ্যে নিজেও কিছু লিখিয়া ‘ভগবদগীতা’ নাম দিয়া ভীষ্মপর্বে সন্নিবেশিত করিয়াছেন।


প্রতিবাদী: তাহা অসম্ভব। কারণ মহাভারতের আদিপর্বের ২য় অধ্যায়-‘পর্বসংগ্রহ অধ্যায়’। সেখানে কোন পর্বে কতগুলি অধ্যায়, কতগুলি শ্লোক, কতগুলি উপপর্ব এবং কি কি বৃত্তান্ত আছে, তাহা মহর্ষি বেদব্যাস নিজেই সূচিপত্রের ন্যায় লিখিয়া গিয়াছেন। সেখানে উল্লিখিত:

“পর্ব্বোক্তং ভগবদবদগীতা পর্ব্ব ভীষ্মবধস্ততঃ”।


পরবর্তীতে আছে:

“কশ্ললং যত্র পার্থস্য বাসুদেবো মহামতিঃ।

মোহজং নাশষামাস হেতুভির্মোক্ষদর্শিভিঃ।।”


আশ্বমেধিকপর্বে অনুগীতাপ্রকরণে স্বয়ং কৃষ্ণই অর্জ্জুনকে বলিয়াছেন-

“পূর্ব্বমপ্যেতদেবোক্তং যুদ্ধকাল উপস্থিতে।

ময়া তব মহাবাহো তস্মাদত্র মনঃ কুরু।।”(আশ্বঃ ৫১/৪৯)



অতএব আদিপর্বে ভগবদগীতাকে একটি উপপর্ব বলিয়াছেন, আবার কৃষ্ণ আশ্বমেধিকপর্বে অনুগীতাপ্রকরণে অর্জ্জুনকে সেই ভগবদগীতার বিষয়ই স্মরণ করাইতেছেন। এ অবস্থায় কোনোভাবেই ভগবদগীতাকে সংগ্রহগ্রন্থ কিংবা প্রক্ষিপ্ত বলা যায় না।

প্রক্ষিপ্তবাদী: (ঈষৎ হাস্য করিয়া) যদি এই অংশগুলিকেও প্রক্ষিপ্ত বলি?

প্রতিবাদী: তাহা হইলে সম্পূর্ণ মহাভারতটাকেই কিংবা নিজেকেই প্রক্ষিপ্ত বলিয়া আমাকে নিষ্কৃতি দিয়া যান।



104 views0 comments

Comments


Be Inspired
bottom of page