top of page

মোহিনী একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য

Updated: Jun 25, 2020

বৈশাখ শুক্লপক্ষীয়া ‘শ্রীমােহিনী একাদশী

বৈশাখ শুক্লপক্ষের ‘মােহিনী একাদশী-ব্রতমাহাত্ম্য সূৰ্য্য-পুরাণে বর্ণিত আছে ।। মহারাজ যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণকে বলিলেন, হে জনার্দন! বৈশাখ শুক্লপক্ষের একাদশীর নাম এবং ব্রত-মাহাত্ম্য আমাকে সবিস্তারে অবগত করান । শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন, হে ধৰ্ম্মপুত্র! প্রথমে রামচন্দ্রজীকে বশিষ্ঠ মুনি যাহা বলিয়াছেন, তাহা শ্রবণ কর । শ্রীরামচন্দ্রজী মুনিবর বশিষ্ঠজীর নিকট কহিলেন, হে মুনিবর, আমি জনক নন্দিনী সীতার বিরতেন দুঃখ পাইতেছি আপনি কৃপা করিয়া আমাকে এমন কোন ব্রতের কথা বলেন যাহা পালনে জীবের সমস্ত পাপ ও দুঃখ নিবৃত্তি হইয়া যায়। তচ্ছবনে গুরুদেব শ্রীবশিষ্ঠজী কহিলেন, হে রাম! আপনার বুদ্ধি শ্রদ্ধাযুক্ত, আপনি অতি উত্তম প্রশ্ন করিয়াছেন, আপনার পরমমঙ্গলময় নাম গ্রহণে ও স্মরণেই মনুষ্য পবিত্র হয়— সকল মঙ্গলের অধিকারী হয় তথাপি লােকহিতকামনায় আপনাকে আমি একটি উত্তম ব্রতের কথা বলিতেছি । হে রাম! বৈশাখ শুক্লপক্ষের একাদশী ‘মােহিনী নামে প্রসিদ্ধা । এই একাদশী ব্রতােত্তম, পালনে মনুষ্যের সকল পাপ—সকল দুঃখ— সকল মােহজাল নিবৃত্ত হইয়া যায় । ইহার পরম পণ্যদায়িনী শুভ কথা আমি আপনাকে বলিতেছি, আপনি একমন চিত্তে শ্রবণ করুন । সুপবিত্র সরস্বতী নদী তটে ‘ভদ্রাবতী’ নাম্নী এক সুশােভনা নগরী ছিল । তথায় ‘দ্যুতিমান্ নামক এক রাজা রাজ্য পরিচালনা করিতেন । হে রাম! ঐ ধৈৰ্যশালী সত্যপ্রতিজ্ঞ নরপতি চন্দ্রবংশে উৎপন্ন হইয়াছিলেন । এই নগরীতে ধনধান্যে মহাসমৃদ্ধিশালী এক ধর্মাত্মা পুণ্যবান্ বিষ্ণুভক্ত বৈশ্য বাস করিতেন। তাহার নাম ছিল—ধনপাল। এই মহাত্মা লােকহিতকল্পে নগরে বহু জলসত্র,অন্নসত্ৰ, পান্থনিবাস বা ধৰ্ম্মশালা, সুপেয় সুগন্ধি পানীয় জলপূর্ণ কূপ, স্বচ্ছ সরােবর, পুষ্পেদ্যান, ফলােদ্যান, প্রশস্ত সরণি, দাতব্য-চিকিৎসালয়, পণ্যবীথিকা, বিদ্যালয়, শ্রী বিষ্ণুমন্দির প্রভৃতি নির্মাণের দ্বারা অর্থের প্রকৃত সদ্ব্যবহার পূর্বক তাহার নামের সার্থকতা সম্পাদন করিয়াছিলেন। পরহিতব্রতী শান্তভাব বিষ্ণুভক্তিপরায়ণ এই পুণ্যাত্মা বৈশ্যের সমান, দ্যুতিমান, মেধাবী, সুকৃতি ধৃষ্টবুদ্ধি নামক পাঁচটি পুত্র ছিল। তন্মধ্যে পঞ্চমপুত্র ধৃষ্টবুদ্ধি ছিল মহাপাপে নিমগ্ন। সে অত্যন্ত দুষ্ট প্রকৃতি, অসৎসঙ্গরত, অসতীবারনারী, ন্যূতক্রীড়া, আসবপানাদিতে আসক্ত, তথা জীবহিংসন, পরপীড়নাদি যাবতীয় অধৰ্ম্মাচারে লিপ্ত হইয়া এমন পরমধাৰ্মিক পিতার কুল-কলঙ্কস্বরূপ অতীব শােচ্য কুলাঙ্গার পুত্ররূপে পরিণত হইল। দেবতা, অতিথি, বৃদ্ধ-পিতৃপুরুষ ও ব্ৰহ্মণগণকে সে কিছুমাত্র সম্মান করিত না। সৰ্ব্বদাই পাপচিন্তারত, পাপাসক্ত ও পাপকর্মে লিপ্ত থাকিয়া অত্যন্ত ঘৃণা।জীবন যাপন করিত।

এই মহাপাপিষ্ঠ দুরাত্মা পিতার ধনসম্পদ সকল নানা অসৎকার্য্যে অপব্যয় করিতে লাগিল। নানা অভক্ষ্য ভক্ষণ করিত ও সৰ্ব্বদা মদিরাপানে বিভাের হইয়া থাকিত। পিতা ধনপাল একদিন ঐ পুত্রকে পতিতার  গলদেশে হস্তাপর্ণপূৰ্ব্বক প্রকাশ্যে চৌরাস্তায় ভ্রমণ করিতে দেখিয়া অত্যন্ত মর্মাহত হইলেন। সেই দিনই তিনি তাহার ঐ উৎপথগামী পুত্রকে গৃহ হইতে বহিস্কৃত করিয়া দিলেন। পিতৃমাতৃস্নেহ-ভ্রাতৃস্নেহ—আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু-বান্ধব—সকলের স্নেহ হইতেই সে বঞ্চিত হইল। জাতিচ্যুত— সমাজচ্যুত অপাংক্তেয় হইয়া সজ্জন-সমাজে সে অত্যন্ত ঘৃণিত হইয়া পড়িল ।  পিতৃগৃহ হইতে বহিস্কৃত হইয়া সে কিছুদিন যাবৎ নিজ ব্যবহাৰ্য্য বস্ত্র-অলঙ্কারাদি বিক্রয় করতঃ তল্লব্ধ অর্থদ্বারা তাহার পাপপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করিতে লাগিল। কিন্তু তাহাও শেষ হইলে ক্রমশঃ ভাবে, সুতরাং যথােচিত খাদ্যাদির অভাবে তাহার শরীর অত্যন্ত।জীর্ণ শীর্ণ হইয়া পড়িল। তাহাকে ধনহীন দেখিয়া কপট প্রণয়-প্রদর্শনকারিনী বারবনিতা ও তথাকথিত বন্ধু বান্ধব গণও নানা ছলে নিন্দা করিতে করিতে তাহাকে ত্যাগ করিল। এক্ষণে অন্নবস্ত্রহীন,অত্যন্ত ক্ষুধা-প্রপীড়িত ধৃষ্টবুদ্ধি চিন্তা করিতে লাগিল, “আমি এখন কি করি, কোথায় যাই, কি উপায় অবলম্বন করিতে পারিলে আমার জীবন রক্ষিত হইতে পারে ? এইরূপ নানাচিন্তার পর সে স্থির সম্ভব হতে পারে; অদ্যাবধি বহু পাপ করার ফলে আমি ধনহীন—গৃহহীন আত্মীয়-স্বজন-স্নেহহীন হইয়া অত্যন্ত মনােদুঃখে কালাতিপাত করিতেছি । তখন পরদুঃখ-কাতর মুনিবর কহিলেন, যাহাতে তােমার অতীব গুরুতর পাপও অনায়াসে অল্পক্ষণে নিঃশেষে ক্ষয় হইয়া যাইতে পারে, তাহার একটি সহজ উপায় আমি তােমাকে বলিতেছি, তুমি একাগ্রচিত্তে তাহা শ্রবণ কর। বৈশাখ মাসে শুক্লপক্ষের। ‘মােহিনী’ নামী একাদশী মনুষ্যের বহুজন্মসঞ্চিত সুমেরুপৰ্বতপ্রমাণ পাপরাশি নিঃশেষে ধ্বংস করিয়া থাকে। অতএব তুমি এই একাদশী-ব্রত বিশেষ শ্রদ্ধাসহকারে পালন কর। মুনিবরের বাক্য-শ্রবণে ধৃষ্টবুদ্ধি প্রসন্ন হইল এবং তাহার উপাদিষ্ট বিধি অনুসারে যথাযথভাবে সেই ব্রত পালন করিল। হে নৃপশ্রেষ্ঠ! এই ‘মােহিনী’বত-পালনে মহাপাপিষ্ঠ। ধৃষ্ঠবুদ্ধি অচিরেই সৰ্ব্বপাপ রহিত হইয়া দিব্যদেহ ধারণপূর্বক গরুড়ারােহণে সৰ্ব্বাপদরহিত বিষ্ণুলােকে চলিয়া গেল। হে রামচন্দ্র... এই ব্রত অজ্ঞানকৃত গাঢ় অন্ধকাররূপী যাবতীয় মহামােহ নষ্ট করিয়া থাকে। তীর্থস্নান, দান, যজ্ঞাদিজনিত কোন পুণ্যই ইহার সমতুল্য নহে।


লিখেছেনঃ শ্রীমান সৈকত কুমার ( বরগুনা, বরিশাল, বাংলাদেশ )


20 views0 comments

Comments


Be Inspired
bottom of page